সংক্ষেপে উত্তর: খেজুর গুড় তৈরি হয় খেজুর গাছের রস জ্বাল দিয়ে। শীতের বিকেলে গাছি গাছের মাথার একটি অংশ চেঁছে সেখানে বাঁশের নল আর মাটির হাঁড়ি বেঁধে দেন। সারা রাত ফোঁটা ফোঁটা রস জমে, আর ভোরে সূর্য ওঠার আগেই রস নামানো হয়। সেই রস ছেঁকে বড় কড়াইয়ে কয়েক ঘণ্টা জ্বাল দিলে তরল ঝোলা গুড় হয়, আর আরও জ্বাল দিয়ে নেড়ে দানা বাঁধিয়ে ছাঁচে ঢাললে হয় পাটালি। প্রায় ১০ থেকে ১২ কেজি রসে এক কেজি গুড় পাওয়া যায়।
শীতের সকালে এক টুকরো পাটালি মুখে দিলে আমরা কেউ হয়তো ভাবি না, এর পেছনে কত মানুষের কত ঘণ্টার পরিশ্রম। কনকনে ঠান্ডায় ভোররাতে গাছে ওঠা, সারাদিন চুলার আগুনের পাশে বসে রস জ্বাল দেওয়া, তারপর ধৈর্য নিয়ে নেড়ে নেড়ে পাটালি বানানো। এই লেখায় খেজুর গাছ প্রস্তুত থেকে শুরু করে গুড় প্যাকেট হওয়া পর্যন্ত পুরো যাত্রা ধাপে ধাপে দেখাচ্ছি। আমরা ২০০৮ সাল থেকে নাটোরে নিজস্ব কারখানায় খেজুর গুড় তৈরি করছি, তাই এই প্রক্রিয়া আমাদের প্রতিদিনের কাজ।
খেজুর গুড় তৈরির মৌসুম
খেজুর গুড় শুধু শীতকালেই তৈরি হয়, কারণ ঠান্ডা আবহাওয়ায় খেজুর গাছ বেশি ও মিষ্টি রস দেয়, আর রস সহজে টক হয় না।
| সময় (বাংলা মাস) | কাজ |
|---|---|
| কার্তিক (অক্টোবর–নভেম্বর) | গাছ পরিষ্কার ও চাঁছা, প্রস্তুতি |
| অগ্রহায়ণ (নভেম্বর–ডিসেম্বর) | রস সংগ্রহ শুরু, প্রথম রসের সুগন্ধি গুড় |
| পৌষ–মাঘ (ডিসেম্বর–ফেব্রুয়ারি) | মৌসুমের সেরা সময়, সবচেয়ে বেশি রস |
| ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারি–মার্চ) | রস কমে, মৌসুম শেষ |
খেজুর গুড় তৈরির ৮টি ধাপ
ধাপ ১: গাছ নির্বাচন ও প্রস্তুতি
সাধারণত পাঁচ-ছয় বছরের বেশি বয়সী সুস্থ খেজুর গাছ থেকে রস নেওয়া হয়। কার্তিক মাসে গাছি গাছের মাথার কাছের পুরনো ডালপালা ছেঁটে ফেলেন। তারপর কাণ্ডের ওপরের দিকের একটি অংশের ছাল তুলে চেঁছে পরিষ্কার করা হয়। নাটোরের লালপুরের গাছিদের ভাষ্যে, চাঁছা অংশ প্রায় দশ দিন শুকাতে দেওয়া হয়, তারপর শুরু হয় রস সংগ্রহ।
ধাপ ২: নল ও হাঁড়ি বাঁধা
বিকেলে গাছি ধারালো দা দিয়ে চাঁছা জায়গায় নতুন করে হালকা একটি কাট দেন। সেখান থেকে রস বের হতে শুরু করে। কাটের নিচে বাঁশের একটি ছোট নল বা কঞ্চি গেঁথে দেওয়া হয়, যাতে রস নল বেয়ে নিচে পড়ে। নলের নিচে দড়ি দিয়ে মাটির হাঁড়ি বা ভাঁড় বেঁধে দেওয়া হয়।
ধাপ ৩: হাঁড়ি ঢেকে রাখা
রাতে বাদুড় রসের হাঁড়িতে মুখ দিতে পারে, যা থেকে নিপাহ ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। তাই কৃষি ও স্বাস্থ্য বিভাগ রসের হাঁড়ি বাঁশের চাটাই বা জাল দিয়ে ঢেকে রাখার পরামর্শ দেয়। এতে পোকামাকড় আর ধুলাবালিও ঢুকতে পারে না। বিস্তারিত: খেজুরের রস ও নিপাহ ভাইরাস।
ধাপ ৪: ভোরে রস সংগ্রহ
সারা রাত ফোঁটা ফোঁটা রস হাঁড়িতে জমে। সূর্য ওঠার আগেই, অনেক সময় রাত সাড়ে তিনটা থেকে, গাছি রস নামাতে শুরু করেন। সূর্যের তাপ লাগলে রস দ্রুত গাঁজন হয়ে টক হয়ে যায়, তখন তা দিয়ে ভালো গুড় হয় না। তাই এই কাজ ভোরেই শেষ করতে হয়। কুয়াশা আর ঠান্ডা বেশি থাকলে একেকটি গাছ থেকে রাতে কয়েক কেজি রস পাওয়া যায়।
ধাপ ৫: রস ছাঁকা
সংগ্রহ করা রস পরিষ্কার কাপড় বা ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে নেওয়া হয়, যাতে পোকামাকড়, পাতা বা ময়লা বাদ যায়। রস যত পরিষ্কার, গুড়ের রং আর স্বাদ তত ভালো।
ধাপ ৬: জ্বাল দেওয়া
ছাঁকা রস বড়, চওড়া লোহার কড়াই বা টিনের তাওয়ায় ঢেলে মাটির চুলায় জ্বাল দেওয়া হয়। জ্বালানি হিসেবে সাধারণত শুকনো খেজুর পাতা, লাকড়ি বা খড় ব্যবহার হয়। রস ফুটতে শুরু করলে ওপরে যে ফেনা ও ময়লা ভেসে ওঠে, তা ঝাঁঝরি দিয়ে তুলে ফেলা হয়। কয়েক ঘণ্টা জ্বাল দেওয়ার পর রস ঘন হয়ে সোনালি-বাদামি রং ধরে। এই ধাপে অভিজ্ঞ কারিগরের চোখ আর অভিজ্ঞতাই ঠিক করে কখন নামাতে হবে।
ধাপ ৭: ঝোলা গুড় বা পাটালি তৈরি
- ঝোলা গুড়: রস যখন মধুর মতো ঘন হয় কিন্তু তখনো তরল, তখন নামিয়ে ঠান্ডা করলে ঝোলা গুড়। একটু বেশি জ্বালে সেমি লিকুইড।
- পাটালি: আরও জ্বাল দিয়ে গুড় যখন আরও ঘন হয়, তখন চুলা থেকে নামিয়ে কাঠের হাতা দিয়ে কড়াইয়ের গায়ে ঘষে ঘষে নাড়তে হয়। এতে গুড় ধীরে ধীরে দানা বাঁধে আর রং হালকা হয়। সঠিক সময়ে মাটির, কাঠের বা স্টিলের ছাঁচে ঢেলে দিলে ঠান্ডা হয়ে পাটালি তৈরি হয়।
পাটালি আর ঝোলা গুড়ের দাম জানতে পড়ুন: পাটালি গুড়ের দাম ও ঝোলা গুড়ের দাম।
ধাপ ৮: ঠান্ডা করা ও প্যাকেজিং
পাটালি ছাঁচে কয়েক ঘণ্টা ঠান্ডা হলে বের করা হয়। তরল গুড় ঠান্ডা হলে পরিষ্কার পাত্রে ভরা হয়। গ্রামে সাধারণত মাটির হাঁড়ি বা টিনে রাখা হয়। আধুনিক কারখানায় মান পরীক্ষার পর ফুড-গ্রেড প্যাকেট আর সিল করা জারে ভরে লেবেল দেওয়া হয়।
সংখ্যায় খেজুর গুড়
| বিষয় | পরিমাণ |
|---|---|
| এক কেজি গুড়ের জন্য রস | প্রায় ১০–১২ কেজি |
| জ্বাল দেওয়ার সময় | কয়েক ঘণ্টা (পরিমাণভেদে ৬–৭ ঘণ্টা পর্যন্ত) |
| একটি গাছ থেকে মৌসুমে গুড় | প্রায় ১৫–২৫ কেজি |
| রস সংগ্রহের মৌসুম | প্রায় তিন থেকে চার মাস |
| নাটোরের লালপুরে খেজুর গাছ | প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার |
গাছের যত্ন: কেন প্রতিদিন রস নেওয়া হয় না
একই জায়গা থেকে টানা রস নিলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে, রস কমে যায়। তাই অভিজ্ঞ গাছিরা কয়েক দিন রস নেওয়ার পর গাছকে দু-তিন দিন বিশ্রাম দেন। বিশ্রামের পর প্রথম দিনের রসকে বলা হয় "জিরান রস", যা সবচেয়ে মিষ্টি, পরিষ্কার আর সুগন্ধি। এই রসের গুড়ের দামও সবচেয়ে বেশি।
রসের রং দেখে গুড়ের মান
অভিজ্ঞ কারিগররা রসের রং আর গন্ধ দেখেই বুঝে যান গুড় কেমন হবে। স্বচ্ছ, পানির মতো পরিষ্কার আর মিষ্টি গন্ধের রস থেকে হালকা রঙের সুগন্ধি গুড় হয়। রস যদি ঘোলাটে হয় বা টক গন্ধ আসে, তার মানে গাঁজন শুরু হয়ে গেছে, তখন গুড়ের রং গাঢ় আর স্বাদ কম হয়। তাই ভালো উৎপাদক টক হয়ে যাওয়া রস আলাদা করে রাখেন।
গাছিদের জীবন ও পরিশ্রম
খেজুর গুড়ের মূল কারিগর গাছিরা। অনেকের নিজের গাছ নেই, মৌসুমের জন্য অন্যের গাছ ভাড়া নেন। নাটোরের লালপুরে একজন গাছি জানিয়েছেন, তিনি প্রতি গাছের জন্য মৌসুমে মালিককে দেন ৪০০ টাকা অথবা ৩ কেজি গুড়। ভোররাতে কোমরে দড়ি বেঁধে লম্বা গাছে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ, আর সারাদিন চুলার পাশে কাজ ক্লান্তিকর। এই কারণে নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আসছে কম, আর খাঁটি খেজুর গুড় দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে।
ভেজাল গুড় কীভাবে তৈরি হয়
খাঁটি গুড়ের এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার তুলনায় ভেজাল গুড় তৈরি অনেক সহজ। অল্প রসের সাথে প্রচুর চিনি, চিটাগুড় বা আখের গুড় মিশিয়ে জ্বাল দেওয়া হয়। রং উজ্জ্বল করতে হাইড্রোজ, আর পাটালি শক্ত করতে চুন বা ফিটকিরি মেশানো হয়। ফলে খরচ কম, পরিমাণ বেশি, কিন্তু স্বাদ, সুবাস আর স্বাস্থ্য সবই নষ্ট। চেনার উপায়: খাঁটি খেজুর গুড় চেনার উপায়।
Root Foods-এর কারখানায় যেভাবে গুড় তৈরি হয়
আমাদের কারখানা নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার হারোয়ার বহিমালী বাজারে। ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতেই আমাদের গুড় তৈরি হয়, সাথে যোগ হয় আধুনিক মান নিয়ন্ত্রণ।
- দীর্ঘদিনের পরিচিত, অভিজ্ঞ গাছিদের কাছ থেকে রস সংগ্রহ
- প্রতিটি ব্যাচ আমাদের কোয়ালিটি কন্ট্রোল টিমের পরীক্ষা
- ফুড-গ্রেড প্যাকেট ও সিল করা লিক-প্রুফ জার, ব্যাচ নম্বর ও তারিখসহ
- BSTI ও BCSIR অনুমোদিত, ল্যাব টেস্টেড
- BAPA ও BOPMA-র সদস্য, EPB তালিকাভুক্ত নিবন্ধিত রপ্তানিকারক
- ২০০৮ সাল থেকে, ৭০ হাজারের বেশি পরিবারের আস্থা
আমাদের সনদগুলো দেখুন: সার্টিফিকেশন পেজ। নাটোরের গুড় নিয়ে আরও পড়ুন: নাটোরের খেজুর গুড়।
সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
খেজুর গুড় কীভাবে তৈরি হয়?
খেজুর গাছের রস ভোরে সংগ্রহ করে ছেঁকে কয়েক ঘণ্টা জ্বাল দিলে গুড় হয়। তরল অবস্থায় নামালে ঝোলা গুড়, আরও জ্বাল দিয়ে নেড়ে ছাঁচে ঢাললে পাটালি।
এক কেজি খেজুর গুড় বানাতে কত রস লাগে?
প্রায় ১০ থেকে ১২ কেজি রস।
খেজুর গুড় শুধু শীতে কেন তৈরি হয়?
ঠান্ডায় খেজুর গাছ বেশি ও মিষ্টি রস দেয়, আর রস সহজে টক হয় না। গরমে রস কমে যায় ও দ্রুত গাঁজন হয়।
জিরান রস কী?
গাছকে কয়েক দিন বিশ্রাম দেওয়ার পর প্রথম দিনের রস। এটি সবচেয়ে মিষ্টি, পরিষ্কার আর সুগন্ধি।
একটি খেজুর গাছ থেকে কত গুড় হয়?
এক মৌসুমে গড়ে প্রায় ১৫ থেকে ২৫ কেজি, গাছ আর আবহাওয়াভেদে।
গাছির পরিশ্রমের খাঁটি গুড়, আপনার ঘরে
নাটোরের নিজস্ব কারখানা থেকে সরাসরি। সারা দেশে হোম ডেলিভারি, ক্যাশ অন ডেলিভারি।
ফোন/হোয়াটসঅ্যাপ: 01882115515 · ইমেইল: contact@rootfoods.com.bd



